প্রগতিশীলতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বিশ্ববিদ্যালয়: দ্বৈত মানসিকতার পুনর্মূল্যায়ন


বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল পাঠদান বা সনদ প্রদানের প্রতিষ্ঠান নয়। এগুলো রাষ্ট্রের বিবেক, সমাজের চিন্তাশীল অংশ এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির কেন্দ্র। সেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেই যখন ধর্মীয় বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত অনুশীলনকে ঘিরে দ্বৈত মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সেটি নিছক মতবিরোধ থাকে না—তা রাষ্ট্রীয় নীতি, সাংবিধানিক চেতনা এবং সামাজিক ন্যায়বোধের ওপর সরাসরি আঘাত হয়ে দাঁড়ায়।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে ধর্মীয় অনুশীলনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা নিছক কোনো ছবি বা বক্তব্যকে ঘিরে নয়। বরং এটি আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে লালিত এক ধরনের দ্বৈত মানসিকতা, বাছাইমূলক প্রগতিশীলতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ে অস্পষ্ট ধারণার বহিঃপ্রকাশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো চিন্তার মুক্তচর্চার কেন্দ্রে এই বিতর্ক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার বা পোশাককে ‘সংস্কৃতি’ ও ‘প্রগতিশীলতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও অন্য একটি ধর্মীয় অনুশীলনকে একই পরিসরে ‘ধর্মান্ধতা’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা আমাদের সামাজিক ন্যায়বোধের ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়।

“গত শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের আয়োজনে ৩৭টি মণ্ডপে অনুষ্ঠিত পূজার মধ্যে ইংরেজি বিভাগের মণ্ডপে পৌরহিত্যের দায়িত্ব পালন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের নারী শিক্ষার্থী সমাদৃতা ভৌমিক। সমাদৃতা ইংরেজি বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।“ -Dhaka-post.com

বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক চরিত্র হলো মুক্তচিন্তা। সেখানে মত থাকবে, বিরোধ থাকবে, বিতর্ক থাকবে—কিন্তু থাকবে সমতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিশ্ববিদ্যালয় পরিসরে এক ধরনের আদর্শিক বাছাই কার্যকর হচ্ছে। নির্দিষ্ট চিন্তা ও সংস্কৃতি ‘গ্রহণযোগ্য’, অন্যগুলো ‘অগ্রহণযোগ্য’। এটি কোনোভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়—সবগুলোর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই প্রতিষ্ঠানগুলো কখনো একমাত্রিক চিন্তার বাহক ছিল না। বরং ভিন্নতার সহাবস্থানই ছিল তাদের শক্তি। আজ যদি বিশ্ববিদ্যালয়েই বলা হয়—তোমার বিশ্বাস গ্রহণযোগ্য নয়, তোমার পোশাক পশ্চাৎপদ—তবে সেই বিশ্ববিদ্যালয় আর মুক্তচিন্তার কেন্দ্র থাকে না; তা হয়ে ওঠে মতাদর্শিক ফিল্টারের যন্ত্র।

বাংলাদেশের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে অত্যন্ত স্পষ্ট। সংবিধানের ৪১() অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—

প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালন, অনুশীলন ও প্রচারের অধিকার রয়েছে।

এই অনুচ্ছেদে ‘শর্তযুক্ত স্বাধীনতা’র কথা নেই। সংবিধান কোনো পোশাক বা আচারকে প্রগতিশীল আর কোনো পোশাককে পশ্চাৎপদ বলে ভাগ করেনি। সংবিধানের প্রস্তাবনায় যে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হয়েছে, তার অর্থ ধর্মকে রাষ্ট্র বা সমাজ থেকে মুছে ফেলা নয়, তার অর্থ ধর্মহীনতা নয়। বরং সব ধর্মের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি। সব ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা ও সমান মর্যাদা নিশ্চিত করাই ধর্মনিরপেক্ষতার মূল চেতনা। একটি ধর্মীয় আচারকে উদারতা আর অন্যটিকে উগ্রতা বলা সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই অনুচ্ছেদে কোথাও বলা হয়নি—এই অধিকার কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, পোশাক বা আচারভিত্তিক হবে। একজন শিক্ষার্থী যদি গেরুয়া বসন পরিধান করে ধর্মীয় আচার পালন করেন, তা যেমন তাঁর সাংবিধানিক অধিকার, তেমনি অন্য একজন শিক্ষার্থী যদি হিজাব বা নিকাব পরিধান করে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হন, সেটিও একই সাংবিধানিক সুরক্ষার আওতায় পড়ে।

ইসলাম ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আমলের বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও মানবিক অবস্থান গ্রহণ করেছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে—

দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই” (সূরা আল-বাকারা: ২৫৬)।

এই আয়াত প্রমাণ করে—বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে কাউকে হেয় করা ইসলামের নীতির পরিপন্থী। আরও বলা হয়েছে—

তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন, আর আমার জন্য আমার দ্বীন” (সূরা আল-কাফিরুন: ৬)।

এই আয়াত ভিন্ন বিশ্বাস ও চর্চার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়। সুতরাং ইসলামের আলোকে কোনো নারী যদি পর্দা পালন করেন, তবে তা তাঁর ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিক সিদ্ধান্ত। একে বিদ্রূপ বা পশ্চাৎপদতা হিসেবে চিহ্নিত করা ইসলামী নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

নারীর পোশাক প্রশ্নে আমাদের সমাজের ভণ্ডামি সবচেয়ে প্রকট। নারীর পোশাক নিয়ে সমাজে যে বিতর্ক চলে, তা প্রায়শই যুক্তির বদলে আবেগ ও বিদ্বেষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কেউ যদি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক চিহ্ন ধারণ করেন, কেউ গেরুয়া বসন পরলে তাঁকে সংস্কৃতিমনা বলা হয় এবং এটিকে বলা হয় উদারতা, আবার কেউ হিজাব বা নিকাব পরলে তাঁকে সংকীর্ণমনা ও অগ্রগতিবিরোধী হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এই তুলনা নিজেই দমনমূলক ও অযৌক্তিক। প্রগতিশীলতা কোনো পোশাকের নাম নয়। একজন নারী কী পরবেন—তা তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস, পারিবারিক মূল্যবোধ ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। পোশাককে রাজনৈতিক বা আদর্শিক অস্ত্র বানানো নারীর মুক্তির নয়, বরং নতুন ধরনের দমন।

প্রগতিশীলতার নামে বিদ্বেষ ছড়ানো প্রকৃত প্রগতিশীলতা নয়। বরং এটি নতুন ধরনের অসহিষ্ণুতা। প্রগতিশীলতার প্রকৃত সংজ্ঞা কী? প্রগতিশীলতা মানে ধর্মবিরোধিতা নয়। প্রগতিশীলতা কোনো নির্দিষ্ট জীবনধারার নাম নয়। এটি একটি নৈতিক অবস্থান । প্রগতিশীলতা মানে—

  • ভিন্ন মতকে সহ্য করার মানসিকতা
  • অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা
  • যুক্তিবোধ ও মানবিক আচরণ

এই সম্পাদকীয়র উদ্দেশ্য হলো—সংবিধান, নৈতিকতা ও মানবিকতার আলোকে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা। আমরা কি সত্যিই সমান অধিকারভিত্তিক সমাজ চাই, নাকি প্রয়োজনমতো প্রগতিশীলতার সংজ্ঞা বদলাই? বিশ্ববিদ্যালয় যদি সত্যিই জ্ঞান ও মুক্তচিন্তার কেন্দ্র হয়, তবে সেখানে কোনো দ্বৈত মানদণ্ডের স্থান নেই। ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রশ্নে সংবিধানকে খণ্ডিতভাবে পড়ার সুযোগ নেই। সময় এসেছে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার— বিশ্বাসের স্বাধীনতা সবার জন্য, নাকি শুধু নির্বাচিতদের জন্য?


Like it? Share with your friends!

0 Comments