বাধ্যতামূলক সংগীত শিক্ষা: রাষ্ট্রীয় নীতি না সাংবিধানিক ও ধর্মীয় সংকটের সূচনা?


সম্পাদকীয়

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কিন দূতাবাস আয়োজিত এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সংগীত শিক্ষা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। (ইত্তেফাক ডিজিটাল রিপোর্ট প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬)

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সংগীত শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার ঘোষণাটি কেবল একটি নীতিগত পরিবর্তন নয়; বরং এটি রাষ্ট্র, ধর্ম এবং নাগরিক অধিকারের মধ্যকার সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী-এর ঘোষণার পরপরই বিষয়টি জনপরিসরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

রাষ্ট্র যখন কোনো নীতিকে “বাধ্যতামূলক” রূপ দেয়, তখন সেটি আর নিছক একটি সুযোগ বা সুবিধা থাকে না; বরং তা নাগরিকের ওপর আরোপিত একটি কাঠামো হয়ে দাঁড়ায়। আর এখানেই প্রশ্ন—সংগীত শিক্ষা কি এমন একটি বিষয়, যা রাষ্ট্র সকল শিক্ষার্থীর ওপর সমানভাবে আরোপ করতে পারে?

কুরআন ও হাদিসের আলোকে: ইসলামে সংগীত নিয়ে মতভেদ থাকলেও, সমালোচকরা কিছু নির্দিষ্ট আয়াত ও হাদিসকে ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছেন- সূরা লুকমান (৩১:৬): এখানে “লাহওয়াল হাদিস” অবান্তর কথাবার্তা (গান-বাজনা) শব্দটি এসেছে, যা বলতে অধিকাংশ মুফাসসির, সাহাবী ও তাবেয়ীগণ গান-বাজনা, বাদ্যযন্ত্র এবং মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া যে কোনো বিনোদনকে বুঝিয়েছেন। এই অসার বাক্য ও অপসংস্কৃতি মানুষকে আল্লাহর ইবাদত ও দ্বীনের জ্ঞান থেকে গাফেল করে রাখে [

  • সূরা আল-ইসরা (১৭:৬৪): শয়তানের কণ্ঠ দ্বারা মানুষকে প্রলুব্ধ করার প্রসঙ্গ উল্লেখ রয়েছে—যা বলতে ইবনে আব্বাস (রা.)-সহ অনেক তাফসিরকারক বাদ্যযন্ত্র, গান-বাজনা, অশ্লীল কথাবার্তা এবং আল্লাহর অবাধ্যতামূলক আহ্বানকে বুঝিয়েছেন । এটি শয়তানের প্ররোচনার প্রতীকী রূপ, যার মাধ্যমে মানুষকে সত্যপথ থেকে বিচ্যুত করে প্রলুব্ধ করা হয়।
  • সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫৫৯০: এখানে এমন এক সময়ের কথা বলা হয়েছে যখন কিছু মানুষ বাদ্যযন্ত্রকে হালাল বলে গণ্য করবে।
  • সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৪০২০: সমাজে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারের প্রসঙ্গে সংগীত ও বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই রেফারেন্সগুলোর ভিত্তিতে অনেক আলেমের মত— সংগীতকে বাধ্যতামূলক করা ইসলামি অনুশাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ।

সাংবিধানিক ও আইনগত বিশ্লেষণ: বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হতে নির্দেশ দেয়।

বাংলাদেশ সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদ: প্রত্যেক নাগরিকের ধর্ম পালন, প্রচার ও অনুশীলনের অধিকার নিশ্চিত করে। এবং সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদ: ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করে।

বাধ্যতামূলক সংগীত শিক্ষা কি ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে পরোক্ষ বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে? এটি কি “freedom of conscience” (বিবেকের স্বাধীনতা)-এর পরিপন্থী? শিক্ষার্থীদের উপর একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক চর্চা আরোপ করা কি রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? আইন বিশ্লেষকদের মতে—শিক্ষা হতে হবে inclusive কিন্তু non-coercive (অ-জবরদস্তিমূলক), কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, তবে বাধ্যতামূলক করা হলে মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকি থাকে, ধর্মীয় স্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে, এটি শিক্ষার্থীদের পছন্দ ও বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে, রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষার অধিকার নিয়ে UNESCO ও Universal Declaration of Human Rights-এর ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—শিক্ষা এমন হতে হবে যা ব্যক্তির পূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করে, অভিভাবকদের সন্তানের শিক্ষার ধরন বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সমালোচকরা বলছেন—বাধ্যতামূলক সংগীত শিক্ষা অভিভাবকের সেই অধিকারকে সীমিত করতে পারে এবং
 এটি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পরিবর্তে একধরনের একরূপতা চাপিয়ে দিতে পারে।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় যেখানে—শিক্ষক সংকট, গ্রামীণ স্কুলগুলোতে মৌলিক সুবিধার অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের চ্যালেঞ্জ। সেখানে সংগীতকে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি সময়োপযোগী, নাকি এটি একটি “policy overreach”?

সমালোচনার মধ্যেও একটি মধ্যপন্থার কথা উঠে এসেছে— ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় রাখা, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতার প্রতি সম্মান রাখা।

প্রসঙ্গক্রমে আরেকটা কথা বলে রাখা ভালো বর্তমান সরকারের একজন মন্ত্রী তিনি নির্বাচনের আগে বলেছিলেন যে, যদি আমাদের সরকার ক্ষমতায় আসে তাহলে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ধর্মীয় শিক্ষকের পদ সৃজন করা হবে এবং ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। কিন্তু বর্তমানে এই বিষয়টাকে পিছনে রেখে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে যা বেশিরভাগ মানুষকে আশাহত করেছে। আমরা চাই তিনি যিনি যেটা বলেছেন তার পূর্ণ বাস্তবায়ন হোক। তার বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ টি নিচে লিংকের মাধ্যমে দেয়া হলো-

https://www.facebook.com/share/v/18gu2qzWjK

 শেষ কথা-একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নীতির শক্তি তার গ্রহণযোগ্যতায়, আরোপে নয়। সংগীত মানবিক বিকাশের একটি উপাদান। তবে একটি মুসলিম-প্রধান ও সাংবিধানিকভাবে সংবেদনশীল রাষ্ট্রে সেটিকে বাধ্যতামূলক করার আগে কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা, ধর্মীয় অনুভূতি, সংবিধানিক অধিকার এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল উন্নয়ন নয়, বরং বিশ্বাস, অধিকার ও বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান রক্ষা করা।

Comments

comments


Like it? Share with your friends!

0 Comments