‘রংপুর বিভাগ ভারতের দখল চাই’: বিসিএস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলার প্রস্তুতি, চাকরিচ্যুতির দাবি


ঢাকা, ০৮ জুন ২০২৬

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী মন্তব্য করে ভাইরাল হওয়া ৪৪তম বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের কর্মকর্তা ও বুয়েট গ্রাজুয়েট প্রতীশ দেবনাথের (খুলনা) (পরিচয় পত্র, জব আইডি প্রয়োজন) বিরুদ্ধে এবার কঠোর আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। গত ৪ জুন তার ব্যক্তিগত আইডি থেকে ‘রংপুর বিভাগ ভারতের দখলে চাই’ লিখে কমেন্ট করার পর থেকেই দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে দেশের মূলধারার গণমাধ্যম ‘আমার দেশ’-এ বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে নড়চড় শুরু হয়েছে।

জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে রাষ্ট্রের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে এমন “মনস্তাত্ত্বিক বিশ্বাসঘাতকতা” করায় ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ও সাইবার আইনে নিয়মিত মামলার পাশাপাশি তাকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের দাবি তুলেছেন আইন বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিক সমাজ।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতীশ দেবনাথ প্রজাতন্ত্রের একজন গেজেটেড কর্মকর্তা হওয়ায় তার এই বক্তব্য কেবল সাধারণ কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতা। তার বিরুদ্ধে মূলত তিনটি প্রধান আইনি ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে:

১. দণ্ডবিধির ১২৪(ক) ধারা (রাষ্ট্রদ্রোহিতা)

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (Penal Code, 1860) এর ধারা ১২৪-ক (Section 124A – Sedition) ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি মৌখিক বা লিখিত শব্দের দ্বারা, অথবা চিহ্নের দ্বারা বা দৃশ্যমান প্রতীকের দ্বারা বাংলাদেশের আইনানুগ সরকারের প্রতি ঘৃণা বা অবজ্ঞা সৃষ্টি করে বা করার চেষ্টা করে, তবে তা রাষ্ট্রদ্রোহিতা। দেশের ভূখণ্ড বা আঞ্চলিক অখণ্ডতা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য সরাসরি এই ধারায় পড়ে। আইনগতভাবে এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড, সেইসাথে অর্থদণ্ড হতে পারে। প্রতীশ দেবনাথের বিরুদ্ধে এই ধারায় নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়েরের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রক্রিয়া শুরু করার দাবি উঠেছে।

২. সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮

সরকারি চাকরি আইন ও শৃঙ্খলা বিধিমালা অনুযায়ী, দেশের ভূখণ্ড নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা সুনির্দিষ্টভাবে ‘গুরুতর অসদাচরণ’ (Misconduct) এবং রাষ্ট্রের প্রতি চরম অআনুগত্যের শামিল। এই বিধির আওতায় তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত (Suspension) এবং তদন্ত সাপেক্ষে permanent dismissal বা স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করার কঠোর প্রশাসনিক শাস্তির বিধান রয়েছে।

  • সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮

(দ্রষ্টব্য: ১৯৮৫ সালের বিধিমালাটি ২০১৮ সালে নতুন করে জারি করা হয়েছে, যা বর্তমানে কার্যকর।)

  • বিধি ৩ (খ) ও (গ) – অসদাচরণ (Misconduct): এখানে ‘অসদাচরণ’ এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী যদি এমন কোনো আচরণ করেন যা একজন সরকারি কর্মচারীর পক্ষে অশোভন বা চাকুরির শৃঙ্খলার পরিপন্থী, তবে তা অসদাচরণ। দেশের ভূখণ্ড বা সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিরূপ মন্তব্য সরাসরি চাকুরির শৃঙ্খলা এবং ‘ভদ্রোচিত আচরণ’ (Conduct unbecoming of an officer) এর পরিপন্থী।
  • বিধি ৩ (ঙ) – নাশকতামূলক কাজ (Subversion): এই ধারাটি এখানে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। যদি কোনো কর্মচারী রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত হন বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ কোনো কাজে সহায়তা করেন, তবে তাকে গুরুতর অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করে সরাসরি চাকরি হতে বরখাস্ত (Dismissal) করা যায়।
  • সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯
  • বিধি ২৫ – রাজনীতি ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজে অংশগ্রহণ: এই বিধি অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এমন কোনো কাজ বা প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বা অখণ্ডতার বিরুদ্ধে যায়। দেশের ভূখণ্ড নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা এই বিধির সরাসরি লঙ্ঘন।
  • বাংলাদেশের সংবিধান – অনুচ্ছেদ ২১
  • অনুচ্ছেদ ২১(১): “সংবিধান ও আইন মান্য করা, শৃঙ্খলা রক্ষা করা, নাগরিক দায়িত্ব পালন করা এবং জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য।”
  • অনুচ্ছেদ ২১(২): “সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।”

রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। এর বিচ্যুতি ঘটলে তিনি আর প্রজাতন্ত্রের কর্মে থাকার যোগ্যতা রাখেন না।

  • শাস্তির প্রক্রিয়া (সাময়িক ও স্থায়ী বরখাস্ত)
  • সাময়িক বরখাস্ত (Suspension): সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ১২ অনুযায়ী, যদি কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ থাকে যার জন্য তাকে ‘গুরু দণ্ড’ (যেমন- বরখাস্ত) দেওয়া হতে পারে, তবে তদন্ত চলাকালীন তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত রাখা যায়।
  • স্থায়ী বরখাস্ত (Dismissal): বিধি ৪(৩)(ঘ) অনুযায়ী, ‘নাশকতামূলক কাজ’ বা ‘গুরুতর অসদাচরণ’ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত বা Dismissal from service করা হয়। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ভবিষ্যতে আর কোনো সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে পারেন না।
  • দণ্ডবিধি (Penal Code, 1860) – যদি বিষয়টি ফৌজদারি অপরাধ হয়

যদি বিরূপ মন্তব্যটি রাষ্ট্রদ্রোহিতার (Sedition) পর্যায়ে পড়ে, তবে দণ্ডবিধির ১২৪-ক (Section 124A) ধারা অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কোনো সরকারি কর্মচারী এই ধারায় দণ্ডিত হলে সংবিধানের ১৩৫(২)(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো কারণ দর্শানো নোটিশ (Show Cause) ছাড়াই তাকে সরাসরি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা সম্ভব।

সারসংক্ষেপ রেফারেন্স: “সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(ঙ) এবং বিধি ৪(৩)(ঘ) এর সাথে পঠিত বাংলাদেশের সংবিধানের ২১ ও ১৩৫ অনুচ্ছেদ।” এই রেফারেন্সগুলো ব্যবহার করে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ক্ষুণ্ণকারী যে কোনো আচরণের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা আইনত বৈধ।

৩. সাইবার নিরাপত্তা আইন (Cyber Security Act)

যেহেতু অভিযুক্ত কর্মকর্তা প্রতীশ দেবনাথ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম (ফেসবুক) ব্যবহার করে এই উসকানিমূলক ও রাষ্ট্রদ্রোহী মন্তব্যটি ছড়িয়েছেন, তাই তার বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করার সুযোগ রয়েছে।

  • সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর ২১ ধারা (বর্তমানে ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের সংশ্লিষ্ট বিধান):

বিষয়: দেশের মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা। ফেসবুকের মতো মাধ্যমে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ক্ষুণ্নকারী বা উসকানিমূলক বক্তব্য প্রচার করা এই ধারার সরাসরি লঙ্ঘন।

  • সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর ৩১ ধারা (আইনশৃঙ্খলা বিনষ্টকারী অপরাধ):

বিষয়: ডিজিটাল মাধ্যমে এমন কোনো তথ্য বা বক্তব্য প্রকাশ বা প্রচার করা, যা বিভিন্ন শ্রেণী বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে এবং জনশৃঙ্খলা (Public Order) বিঘ্নিত করে।

এই আইনের আওতায় রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা বিনষ্টের অপচেষ্টার অপরাধে তাকে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং অনাদায়ী কারাদণ্ডের দাবি জানানো হয়েছে।

ফেসবুকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আরাফাত রহমানসহ একাধিক নাগরিক অধিকার কর্মী জানিয়েছেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মে থেকে যারা মনস্তাত্ত্বিক আনুগত্য অন্য দেশকে দেয়, তাদের এক মুহূর্তও সরকারি চাকরিতে রাখার সুযোগ নেই। অবিলম্বে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২৪(ক) ধারায় মামলা করে তাকে গ্রেপ্তার করা না হলে সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদান এবং আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে।

Sources:

  1. Pritish Debnath’s personal facebook ID

Comments

comments


Like it? Share with your friends!

0 Comments